আনন্দবাংলা
আনন্দবাংলা
আপডেট : রবিবার ২১শে জুন ২০২৬, ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ
ক্যাপশন নেই
বাবা— মাত্র দুটি অক্ষরের একটি শব্দ, কিন্তু এর গভীরতা ও বিস্তৃতি অসীম। ভালোবাসা, নিরাপত্তা, দায়িত্ববোধ এবং নির্ভরতার এক অনন্য প্রতীক এই মানুষটিকে সম্মান জানাতেই প্রতি বছর জুন মাসের তৃতীয় রোববার বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব বাবা দিবস।
আজ রোববার (২১ জুন) বিশ্ব বাবা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও দিনটি নানা আয়োজনে পালিত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাবাদের প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা জানিয়ে অসংখ্য মানুষ স্মৃতিচারণ করছেন, ভাগ করে নিচ্ছেন জীবনের মূল্যবান মুহূর্তগুলো।
একজন বাবা কেবল পরিবারের উপার্জনকারী নন; তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, প্রথম পথপ্রদর্শক এবং জীবনের প্রতিটি সংকটে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। নিজের স্বপ্ন, ইচ্ছা ও ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পেছনে নীরবে কাজ করেন তিনি।
মায়ের ভালোবাসা যেমন সহজেই প্রকাশ পায়, বাবার ভালোবাসা তেমনি অনেক সময় থাকে আড়ালে। তিনি হয়তো খুব বেশি আবেগ প্রকাশ করেন না, কিন্তু পরিবারের প্রতিটি প্রয়োজন পূরণে তার নিরলস পরিশ্রমই হয়ে ওঠে ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রকাশ।
বিশ্ব বাবা দিবসের সূচনা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। এ দিবসকে প্রতিষ্ঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সনোরা স্মার্ট ডড। মায়ের মৃত্যুর পর তার বাবা একাই সাত সন্তানকে বড় করে তোলেন। বাবার সেই অসাধারণ ত্যাগ ও সংগ্রাম ডডকে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করে। মা দিবস থাকলেও বাবাদের সম্মান জানাতে কোনো বিশেষ দিন না থাকায় তিনি একটি পৃথক দিবসের দাবি তোলেন।
তার উদ্যোগ ও দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফল হিসেবে ১৯১০ সালের ১৯ জুন প্রথমবারের মতো বাবা দিবস উদযাপিত হয়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হতে শুরু করে।
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সমাজে বাবাদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। তারা নিজের কষ্ট, উদ্বেগ কিংবা ক্লান্তির কথা খুব কমই প্রকাশ করেন। সংসারের ব্যয়ভার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও সামাজিক দায়িত্ব— সবকিছু নীরবে কাঁধে বহন করেন। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরাও বুঝতে পারেন না, একজন বাবা কতটা মানসিক চাপ ও দায়িত্বের মধ্যে দিয়ে দিন কাটান।
আমাদের চারপাশে এমন অসংখ্য বাবা রয়েছেন, যারা নিজের প্রয়োজনকে পেছনে রেখে সন্তানের স্বপ্ন পূরণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন। হয়তো নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনেননি, কিন্তু সন্তানের শিক্ষার খরচে কখনও কার্পণ্য করেননি। হয়তো নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দিয়েছেন, কিন্তু সন্তানের প্রয়োজন মেটাতে কোনো ত্রুটি রাখেননি।
সমাজে বাবাদের আবেগ প্রকাশ নিয়েও এক ধরনের অলিখিত বাধা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, একজন পুরুষকে সব সময় দৃঢ় থাকতে হবে। ফলে একজন বাবা তার ভয়, হতাশা কিংবা মানসিক ক্লান্তির কথা সহজে প্রকাশ করতে পারেন না। অথচ তারও অনুভূতি আছে, আছে না বলা অনেক গল্প।
প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে পারিবারিক যোগাযোগও অনেকটাই কমে এসেছে। একসময় পরিবারের সবাই একসঙ্গে সময় কাটালেও এখন ব্যস্ততা আর ডিজিটাল জীবনের কারণে সেই সুযোগ কমে গেছে। ফলে বাবার নীরব উপস্থিতি অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যায় পরিবারের দৈনন্দিন জীবনে।
বিশ্ব বাবা দিবস তাই কেবল শুভেচ্ছা বিনিময়ের উপলক্ষ নয়; এটি একজন বাবার নীরব অবদান, ত্যাগ ও দায়িত্বকে নতুন করে উপলব্ধি করার দিন। যে মানুষটি হয়তো খুব কম বলেছেন ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’, কিন্তু প্রতিটি কাজে সেই ভালোবাসারই প্রমাণ রেখে গেছেন।
যাদের বাবা জীবিত আছেন, তারা আজ কিছুটা সময় বাবার সঙ্গে কাটাতে পারেন। তার খোঁজ নিতে পারেন, জানতে পারেন তিনি কেমন আছেন। আর যাদের বাবা আর বেঁচে নেই, তাদের জন্য দিনটি স্মৃতি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ভরা এক আবেগঘন উপলক্ষ।
বিশ্ব বাবা দিবসে তাই শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট নয়, প্রয়োজন সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় করা। বাবার নীরব ত্যাগকে সম্মান জানানো, তার অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাই হতে পারে এ দিনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।
কারণ পৃথিবীর অনেক ভালোবাসা শব্দে প্রকাশ পায়, কিন্তু বাবার ভালোবাসা প্রকাশ পায় দায়িত্বে। আর সেই দায়িত্বের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে এক অনন্ত ভালোবাসার গল্প।