অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত

অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সমন্বয় কমিটির প্রথম সভা অনুষ্ঠিত

ছবি সংগৃহীত

বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের নিমিত্ত গঠিত 'সমন্বয় কমিটি'র এক উচ্চপর্যায়ের সভা আজ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে এবং স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মোঃ কামরুজ্জামান চৌধুরীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এই সভায় যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষরিত ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং সচিববৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করেছে । সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণকে সরকারের অন্যতম শীর্ষ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি গতানুগতিক চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে নতুন ও উদ্ভাবনী পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধের জন্য বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, সুস্থ থাকার জন্য জনসাধারণকে হাঁটাচলা ও কায়িক পরিশ্রম করতে হবে। কোনো কোনো দেশে জনসাধারণকে প্রতিদিন অন্তত ৩ কিমি হাঁটাচলা করতে দেখেছি। তিনি বলেন, আমরা যদি মানুষকে বুঝাতে পারি ওষুধ বা চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে জোর দেয়া দরকার তাহলে অসংক্রামক রোগ কমে আসবে।

উল্লেখ্য বর্তমানে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার মতো অসংক্রামক রোগসমূহ বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশেরও বেশির জন্য দায়ী । এর মধ্যে প্রায় ৫১ শতাংশ মৃত্যুই অকালপ্রাপ্ত, যা দেশের অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতা ও জাতীয় টেকসই উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় গতবছর ২০ আগস্ট ২০২৫ তারিখে সরকারের ৩৫টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের যৌথ অংশগ্রহণে একটি ঐতিহাসিক 'যৌথ ঘোষণা' স্বাক্ষরিত হয় । তারই ধারাবাহিকতায় একটি শক্তিশালী সমন্বিত পদক্ষেপ বা 'হোল-অব-গভর্নমেন্ট' পদ্ধতি নিশ্চিত করতে গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে এই সমন্বয় কমিটি গঠন করে গেজেট প্রকাশ করা হয় ।

সভায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সিনিয়র সচিব, সচিববৃন্দ এবং মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে এবং 'যৌথ ঘোষণা' কার্যকরভাবে বাস্তবায়নে তাদের অভিজ্ঞতা প্রসূত মতামত, পর্যবেক্ষণ ও গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশসমূহ উপস্থাপন করেন। ডা. আহমেদ জামশীদ মোহাম্মদ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বাংলাদেশ প্রতিনিধি, বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় সকল কারিগরি সহায়তা প্রদানে তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

সভায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-সহ অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি নিম্নোক্ত সহযোগিতার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়ঃ

•    ‘Health in All Policies’ নীতিগত দিকনির্দেশনা: প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কর্তৃক গৃহীত নীতি, কর্মকৌশল ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ‘Health in All Policies’ বা 'সব নীতিতে স্বাস্থ্য' সংক্রান্ত নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রদান। বিশেষ করে, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রতিটি প্রকল্পে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা।

•    সমন্বিত পদ্ধতিতে জনসচেতনতা সৃষ্টি: অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক সরকারি ও সর্বাত্মক সামাজিক (Whole-of-Government and Whole-of-Society) পদ্ধতিতে দেশব্যাপী ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরিতে সংশ্লিষ্ট সকলকে সক্রিয় সহযোগিতা প্রদান।

•    সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন: ঐতিহাসিক ‘যৌথ ঘোষণা’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও বিভাগ কর্তৃক নিজস্ব খাতের উপযোগী একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান।

•    সম্পদ ও কারিগরি সহায়তার সংস্থান: প্রণীত মন্ত্রণালয়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনাসমূহ সফলভাবে বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক বরাদ্দ, বার্ষিক ও মধ্যমেয়াদী বাজেট কাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ এবং কারিগরি সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের দৃষ্টি আকর্ষণ।

•    অগ্রগতি তদারকি ও সূচক নির্ধারণ: গৃহীত কর্মপরিকল্পনাগুলোর বাস্তবায়ন ও অগ্রগতি নিয়মিত তদারকি করার জন্য সুনির্দিষ্ট, পরিমাপযোগ্য ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন সূচক (Indicators) নির্ধারণ এবং তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা।

•    প্রতিবন্ধকতা নিরসন ও কৌশলগত নির্দেশনা: কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ে বা নীতিগতভাবে যেসব চ্যালেঞ্জ বা প্রতিবন্ধকতা দেখা দেবে, সেগুলো চিহ্নিত করে তা নিরসনে কার্যকর ও কৌশলগত দিকনির্দেশনা প্রদান।

•    বার্ষিক প্রতিবেদন ও অগ্রাধিকার অনুমোদন: বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত বার্ষিক সমন্বিত অগ্রগতি প্রতিবেদন মূল্যায়ন করা এবং পরবর্তী বছরের অগ্রাধিকারমূলক কার্যক্রমসমূহ পর্যালোচনা ও অনুমোদন প্রদান।

এছাড়াও সভায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়ঃ

•    আগামী এক মাসের মধ্যে সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়ন, সমন্বয় এবং অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রদানের জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (ফোকাল পয়েন্ট) মনোনয়ন দেবে।

•    মনোনীত ফোকাল পয়েন্টদের জন্য অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রমাণভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক এবং ব্যয়-সাশ্রয়ী পদক্ষেপ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর সুপারিশকৃত NCD Best Buy interventions এবং যৌথ ঘোষণা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা বিষয়ে ওরিয়েন্টেশন প্রদান করা হবে। এ কার্যক্রমে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থাসমূহ প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে।

•    আগামী ১–৩ মাসের মধ্যে সকল মন্ত্রণালয়/বিভাগ নিজ নিজ খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবে, যার মধ্যে বাস্তবায়ন মনিটরিং কাঠামো, পরিমাপযোগ্য সূচক এবং অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।